বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিল ধারণের জায়গা নেই। বিশেষ করে কুরুকপাতা ইউনিয়নে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে এবং বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. হানিফ চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আক্রান্তদের অধিকাংশেরই বয়স ১ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এবং তারা ম্রো ও মারমা সম্প্রদায়ের।
কুরুকপাতায় বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর সহায়তায় উপজেলার সবচেয়ে দুর্গম ইউনিয়ন কুরুকপাতার স্থানীয় বাজারে একটি অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বর্তমানে হামের রোগী আসলে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী জানান, কুরুকপাতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সেখানে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের দল কাজ করছে। কুরুকপাতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো জানিয়েছেন, এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় ইতোমধ্যেই কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুরুকপাতা থেকে আলীকদম সদর হাসপাতালে আসতে যাতায়াত খরচ যেমন অনেক বেশি, তেমনি দুর্গম পাহাড়ি পথে অসুস্থ শিশুকে নিয়ে আসা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এছাড়া মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জরুরি সময়ে অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহনের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, দুর্গম এলাকায় টিকাদান কর্মসূচির আওতা কম হওয়া এবং সচেতনতার অভাবে এই প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকায় বাড়তি ওষুধ সরবরাহ এবং মেডিকেল টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা দুর্গম পাড়াগুলো থেকে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে আসতে এবং সুস্থ হওয়ার পর বাড়িতে পৌঁছে দিতে সহায়তা করছেন। এছাড়া ঝর্ণার পানি ফুটিয়ে খাওয়া এবং শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে পাড়াগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
“ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন”-এর সভাপতি সেথং ম্রো জানান, ২য় দফায় ৫ জনসহ সর্বমোট ৮০ জন ম্রো হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। বর্তমানে ৭০ জন রোগী আলীকদম উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি তারাও রোগীদের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন। জানা গেছে, ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত ৫ জন শিশু মারা গেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মো. হানিফ চৌধুরী বলেন, আলীকদমে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বর্তমানে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র সংকট। আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ৩১ শয্যার এই হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই।
তিনি আরও বলেন, শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক ও কষ্টসাধ্য। এছাড়া দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ার কারণে সময়মতো রোগীদের হাসপাতালে আনা এবং সেখানে তাদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে পর্যাপ্ত জনবল ও সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যে একযোগে এত বিপুল সংখ্যক রোগীকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানে। কুরুকপাতার মতো দুর্গম ইউনিয়নে যাতায়াত ব্যবস্থা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের ফলে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া আরও বেশি জটিল হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিল ধারণের জায়গা নেই। বিশেষ করে কুরুকপাতা ইউনিয়নে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে এবং বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. হানিফ চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আক্রান্তদের অধিকাংশেরই বয়স ১ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এবং তারা ম্রো ও মারমা সম্প্রদায়ের।
কুরুকপাতায় বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর সহায়তায় উপজেলার সবচেয়ে দুর্গম ইউনিয়ন কুরুকপাতার স্থানীয় বাজারে একটি অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বর্তমানে হামের রোগী আসলে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী জানান, কুরুকপাতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সেখানে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের দল কাজ করছে। কুরুকপাতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো জানিয়েছেন, এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় ইতোমধ্যেই কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুরুকপাতা থেকে আলীকদম সদর হাসপাতালে আসতে যাতায়াত খরচ যেমন অনেক বেশি, তেমনি দুর্গম পাহাড়ি পথে অসুস্থ শিশুকে নিয়ে আসা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এছাড়া মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জরুরি সময়ে অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহনের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, দুর্গম এলাকায় টিকাদান কর্মসূচির আওতা কম হওয়া এবং সচেতনতার অভাবে এই প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্ত এলাকায় বাড়তি ওষুধ সরবরাহ এবং মেডিকেল টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা দুর্গম পাড়াগুলো থেকে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে আসতে এবং সুস্থ হওয়ার পর বাড়িতে পৌঁছে দিতে সহায়তা করছেন। এছাড়া ঝর্ণার পানি ফুটিয়ে খাওয়া এবং শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে পাড়াগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
“ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন”-এর সভাপতি সেথং ম্রো জানান, ২য় দফায় ৫ জনসহ সর্বমোট ৮০ জন ম্রো হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। বর্তমানে ৭০ জন রোগী আলীকদম উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি তারাও রোগীদের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন। জানা গেছে, ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত ৫ জন শিশু মারা গেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মো. হানিফ চৌধুরী বলেন, আলীকদমে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বর্তমানে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র সংকট। আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ৩১ শয্যার এই হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই।
তিনি আরও বলেন, শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক ও কষ্টসাধ্য। এছাড়া দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ার কারণে সময়মতো রোগীদের হাসপাতালে আনা এবং সেখানে তাদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে পর্যাপ্ত জনবল ও সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যে একযোগে এত বিপুল সংখ্যক রোগীকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানে। কুরুকপাতার মতো দুর্গম ইউনিয়নে যাতায়াত ব্যবস্থা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের ফলে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া আরও বেশি জটিল হয়ে পড়েছে।

আপনার মতামত লিখুন